অবাক পৃথিবী

নভেম্বর 21, 2009

ইনডেমনিটির আদ্যোপান্ত (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা-05)


ইনডেমনিটির আদ্যোপান্ত

জাহাঙ্গীর আলম | তারিখ: ১৯-১১-২০০৯

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। সেদিন ছিল শুক্রবার। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর আছে। মোশতাকের স্বাক্ষরের পর আধ্যাদেশে তত্কালীন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমানের স্বাক্ষর আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দেন।
অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত্ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।
দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাত্ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসাবে আবিভূর্ত হন। সে সময় বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল জনাব সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’। এটি এখন সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের ১৮ অনুচ্ছেদে সংযুক্ত আছে।
এতে বলা হয়েছে, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ, ও অন্যান্য আইন, এবং উক্ত মেয়াদের মধ্যে অনুরূপ কোনো ফরমান দ্বারা এই সংবিধানের যে সকল সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন ও বিলোপসাধন করা হইয়াছে তাহা, এবং অনুরূপ কোনো ফরমান, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ বা অন্য কোনো আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত ক্ষমতাবলে, অথবা অনুরূপ কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে গিয়া বা অনুরূপ বিবেচনায় কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত কোনো আদেশ কিংবা প্রদত্ত কোনো দণ্ডাদেশ কার্যকর বা পালন করিবার জন্য উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কৃত কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ, অথবা প্রণীত, কৃত, বা গৃহীত বলিয়া বিবেচিত আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তত্সম্পর্কে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো কারণেই কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেওয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়। মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেওয়া না হলে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেননি। ফলে দায়মুক্তি পেয়ে খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ ২১ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। ওই বছর ২৩ জুন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা জার্মানীতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার আইনি বাধা অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (রহিতকরণ) বিল, ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদে উত্থাপন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর আইনটি সংসদে পাস হয়। ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর এটি পরিপূর্ণভাবে আইনে পরিণত হয়। ফলে মোশতাকের জারি করা এবং জিয়াউর রহমানের সময় বৈধতা পাওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত বলে গণ্য হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়ের করা হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।

source: http://www.prothom-alo.com/detail/news/20381

১৫ আগস্টের আগে ও পরে যেসব খবর ছাপা হয় (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা-04)





১৫ আগস্টের আগে ও পরে যেসব খবর ছাপা হয়

শরিফুজ্জামান | তারিখ: ১৯-১১-২০০৯

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ছিল শুক্রবার। সকালে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ওই খবর ফলাও করে পত্রিকায় ছাপা হয়। দৈনিক বাংলা ও ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত হয় আট পৃষ্ঠার বিশেষ ক্রোড়পত্র। আর এই পত্রিকা পাঠকের হাতে পৌঁছানোর আগেই সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭৫ সালের ১ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সংবাদপত্রের খবর ছিল অনেকটাই বাকশালকেন্দ্রিক। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করা হয়। কিন্তু আগস্টে বাকশালের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এর পাশাপাশি, বঙ্গবন্ধু সরকারকে উত্খাতের ষড়যন্ত্র যে চলছিল তার প্রমাণ ১৫ আগস্ট।
দৈনিক ইত্তেফাক-এর ৪ আগস্ট সংখ্যার শীর্ষ খবর ছিল ‘জেলা বাকশাল সম্পাদক ও যুগ্ম সম্পাদকদের নাম ঘোষণা’। ওই দিন দৈনিক বাংলার শীর্ষ খবর ছিল ‘জাতীয় দলের জেলা সম্পাদকদের নাম ঘোষণা’। ওই খবরের উপশিরোনামে বলা হয়, প্রতিটি কমিটিতে একজন সাধারণ সম্পাদক ও পাঁচজন যুগ্ম সম্পাদক নিয়োগ। ৫ আগস্ট বাকশালের জেলা সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের খবর ছাপা হয় দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায়। অবশ্য ওই দিন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাকের বরাত দিয়ে পত্রিকাটির শীর্ষ খবরে বলা হয় ‘আটটি দেশের সঙ্গে শুল্ক রহিতের চুক্তি হবে।’
বাকশাল নিয়ে ১০টি খবর: ১৫ আগস্ট দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় বাকশাল নিয়ে ১০টি খবর প্রকাশিত হয়। প্রধান শিরোনাম ছিল ‘গ্রামপর্যায়ে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে’। শিল্পমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান বাকশাল জেলা সম্পাদকদের প্রশিক্ষণ কোর্সে এ কথা বলেন। ওই অনুষ্ঠানে প্রত্যেক মন্ত্রীর বক্তব্য আলাদা শিরোনামে এক বা দুই কলামে প্রকাশ হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চাই পরিকল্পিত জনসংখ্যা’। শ্রম ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী বলেন, ‘প্রথম পরিকল্পনাকালে ৪১ লাখ নতুন চাকরি হবে’। শিক্ষামন্ত্রী মোজাফফর আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘দ্বিতীয় বিপ্লব সফল করতে সততার সাথে কাজ করুন’। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথ’। বাকশালের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনি জেলা সম্পাদকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না’। এ ছাড়া প্রথম পৃষ্ঠায় আরেকটি খবরের শিরোনাম ছিল, বঙ্গবন্ধু কাল জেলা গভর্নর ও সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবেন। অপর খবরটি ছিল জেলা সম্পাদক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল।
দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় বাকশাল নিয়ে ১০টি খবর প্রকাশ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট যে তখন সরকার কর্মকাণ্ড ছিল মূলত বাকশালকেন্দ্রিক। ১৪ আগস্টের পত্রিকায়ও বাকশাল জেলা সম্পাদকদের প্রশিক্ষণ কোর্সে তথ্যমন্ত্রী কোরবান আলীর ‘অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই দ্বিতীয় বিপ্লব’ শীর্ষক বক্তব্য শীর্ষ খবর হিসেবে ছাপা হয়। এ ছাড়া জিল্লুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মনি, অধ্যাপক ইউসুফ আলীসহ কয়েকজন বাকশাল নেতার বক্তব্য পৃথক শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল। ১৩ আগস্টও দৈনিক বাংলার খবরে প্রাধান্য পায় বাকশালের খবর।
সেদিন সেজেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ১৫ আগস্ট, রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। ওই দিন দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠায় বাম পাশে দুই কলামে প্রধান খবরে বলা হয়, ‘বঙ্গবন্ধু আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করবেন।’ এ খবরের পাশাপাশি আরেকটি খবর ছিল ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণের সাড়া’। পত্রিকার শেষ পাতায় বঙ্গবন্ধুর হাস্যোজ্জ্বল ছবি দিয়ে বক্স ফিচার ছিল ‘বঙ্গবন্ধুকে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাগত জানাবে’। ওই দিন সকালে পাঠক পত্রিকায় এ খবর পেলেও তার আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। অবশ্য ওই দিন কোনো সংবাদমাধ্যম সে খবর প্রকাশ করতে পারেনি।
দৈনিক বাংলায় যা ছাপা হয়েছিল: বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরদিন ১৬ আগস্ট দৈনিক বাংলার শীর্ষ খবর ছিল ‘খন্দকার মোশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি’। ওই খবরের উপশিরোনামে ছোট্ট করে বলা হয়, ‘শেখ মুজিব নিহত: সামরিক আইন ও সান্ধ্য আইন জারি: সশস্ত্র বাহিনীসমূহের আনুগত্য প্রকাশ’।
খবরের প্রথম অনুচ্ছেদ ছিল—‘শুক্রবার সকালে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পতন ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করে। সশস্ত্র বাহিনীর এই ক্ষমতা গ্রহণের সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে নিহত হন বলে বলে ঘোষণা করা হয়।’
সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস-এর বরাত দিয়ে একই খবরে বলা হয়, সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক আইন ঘোষণা ও সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। দুপুরের পর অবশ্য মুসল্লিদের জুমার নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে দেড় ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন তুলে নেওয়া হয়।
ওই খবরে অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের কাছ থেকে খন্দকার মোশতাকের শপথ নেওয়ার তথ্য, মোহাম্মদ উল্লাহকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ, ১০ মন্ত্রী ও ছয় প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়। আরও উল্লেখ করা হয়, সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান কমোডর মোশাররফ হোসেন খান এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার পৃথক পৃথক বেতার ভাষণে মোশতাক আহমদের নেতৃত্বাধীন নয়া সরকারের প্রতি আনুগত্য ও দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান, রক্ষীবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সাবিউদ্দিন আহমেদ এবং আইজিপি এ এইচ নুরুল ইসলাম বেতার মারফত মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন মর্মে খবর প্রকাশ করা হয়।
ওই সংখ্যায় শীর্ষ খবরের বাঁ পাশে ছিল অস্থায়ী প্রধান বিচারপতির কাছে মোশতাকের শপথ নেওয়ার ছবি। এর নিচে ছিল ‘দুর্নীতির সঙ্গে আপস নেই’ মর্মে মোশতাকের বেতার ভাষণ। ওই ভাষণের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা। এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এবং বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঠিক ও সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপদানের পূত-পবিত্র দায়িত্ব সামগ্রিক ও সমষ্টিগতভাবে সম্পাদনের জন্য পরম করুণমায় আল্লাহ তায়ালা ও বাংলাদেশের গণমানুষের দোয়ার ওপর ভরসা করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সরকারের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়েছে। বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের বজ্রকঠিন দায়িত্ব সম্পাদনের পথ সুগম করার জন্য বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সত্যিকারের বীরের মতো অকুতোভয়চিত্তে এগিয়ে এসেছেন।’
দৈনিক ইত্তেফাকে যা ছাপা হয়েছিল: ১৬ আগস্ট ইত্তেফাকে মূল শিরোনাম ছিল ‘খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসনক্ষমতা গ্রহণ’। খবরের কোথাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়নি। শীর্ষ খবরের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী জাতির বৃহত্তর স্বার্থে গতকাল প্রত্যুষে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া দেশের শাসনভার গ্রহণ করিয়াছেন। শাসনভার গ্রহণকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বীয় বাসভবনে নিহত হইয়াছেন।’
ওই দিন ইত্তেফাকের বিশেষ সম্পাদকীয় ছিল ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’। এর শুরুতে বলা হয়, দেশ ও জাতির এক ঐতিহাসিক প্রয়োজন পূরণে গতকাল প্রত্যুষে প্রবীণ জননায়ক খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সরকারের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াছেন। পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছেন।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনে এই পরিবর্তনের এক বিষাদময় গুরুত্ব রহিয়াছে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা একদিন যে স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছিলাম সেখানে আমাদের আশা ও স্বপ্ন ছিল অপরিমেয়। কিন্তু গত সাড়ে তিন বছরেরও ঊর্ধ্বকালে দেশবাসী বাস্তবক্ষেত্রে যাহা লাভ করিয়াছে তাহাকে এক কথায় গভীর হতাশা ও বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। …গণমানুষের ভাগ্য উন্নয়নের পরিবর্তে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখিবার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষায় মাতিয়া উঠিয়া স্বাধীনতার সুফল হইতে জনগণকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করা হইয়াছে।’ সম্পাদকীয়তে এসব প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সামরিক হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠার কথা উল্লেখ করা হয়।
১৬ আগস্টের ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবার ও নিরাপত্তাকর্মীদের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কোনো তথ্য ছিল না। অন্যান্য খবরের মধ্যে ছিল মোশতাক সরকারের প্রতি পাকিস্তানের স্বীকৃতি, নয়া সরকারের জন্য জুমার নামাজ শেষে বিশেষ মোনাজাত, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক কূটনৈতিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ, বিদেশি দূতাবাসের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার আশ্বাস, গাজী গোলাম মোস্তফাকে অপসারণ করে বি এ সিদ্দিকীকে রেডক্রসের চেয়ারম্যান নিয়োগ, লন্ডন হাইকমিশন ভবনে বিক্ষোভ ও সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নামিয়ে ফেলাসহ কয়েকটি খবর।
ওসমানি, জিয়া, এরশাদ ও ভাসানী: ২৪ আগস্ট মোশতাক সরকারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা পরদিন সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়। রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান জেনারেল এম এ জি ওসমানি। দৈনিক বাংলায় এ সংক্রান্ত খবরে বলা হয়, জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ওসমানী জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। একদলীয় শাসন পদ্ধতি নিয়ে মতানৈক্যের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন। ওই দিনের পত্রিকায় মওলানা হামিদ খান ভাসানী বিবৃতিতে বলেন, মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোক মুজিব সরকারের সহায়তায় বিদেশি শোষকদের সঙ্গে আঁতাত করে কোটি কোটি টাকার সম্পদ দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছে। তিনি দুর্নীতিবাজদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাদের কঠোর সাজা দেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে ২৪ আগস্ট সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং দৈনিক বাংলায় এটা ছিল মূল খবর। এতে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে রদবদলের খবর প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দিয়ে কে এম সফিউল্লাহর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভারতে প্রশিক্ষণরত ব্রিগেডিয়ার এইচ এম এরশাদকে মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় উন্নীত করে মেজর জিয়ার স্থলে ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার কাজী গোলাম দস্তগিরকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে বিডিআরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অন্যান্য খবর: ১৫ আগস্টের পর সংবাদমাধ্যমে মোশতাক সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। এ ছাড়া উন্নয়ন ও আশাব্যঞ্জক খবর প্রকাশিত হয়। ২০ আগস্ট দৈনিক বাংলার শীর্ষ খবর ছিল ‘নয়া সরকারের সাথে বাদশাহ খালেদের ইসলামী সংহতি প্রকাশ, সৌদী আরব ও সুদানের স্বীকৃতি’। ওই দিন প্রথম পৃষ্ঠায় ছবিসহ খন্দকার মোশতাকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ছাপা হয়। আরেক খবরে বলা হয়, ‘দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক’।
২৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী, উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রী কোরবান আলী ও আব্দুস সামাদ আজাদসহ ২৬ শীর্ষ মন্ত্রী, সাংসদ ও বাকশাল নেতাকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। ওই সময়ের পত্রিকায় ভারত, পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সুদানসহ বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বড় করে ছাপা হয়।
২২ আগস্ট মোশতাক সরকার দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদ তাদের আগের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তথ্যমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের এই ঘোষণা ২৩ আগস্ট দৈনিক বাংলায় ছাপা হয়।
pintu.dhaka

source: http://www.prothom-alo.com/detail/news/20382

মাটির সন্তান যে মাটিতে শুয়ে (বঙ্গব ন্ধু হত্যা মামলা -03)


মাটির সন্তান যে মাটিতে শুয়ে

আনিসুল হক | তারিখ: ২১-১১-২০০৯

আলোকচিত্র: নাসির আলী মামুন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান আর সমাধিস্থল টুঙ্গিপাড়া ঘুরে এসে লিখেছেন আনিসুল হক

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫০ সালে ফরিদপুর কারাগার থেকে তাঁর নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন (চিঠিটা কারা কর্তৃপক্ষ বাজেয়াপ্ত করে), ‘আমাকে ফরিদপুর জেল থেকে গোপালগঞ্জ আদালতে হাজিরা দিতে হয়। ফরিদপুর থেকে গোপালগঞ্জ একবার যেতে সময় লাগে ৬০ ঘণ্টা।’ আর গোপালগঞ্জ থেকে টুঙ্গিপাড়া যেতে হতো কীভাবে? সময় লাগত কত? গোপালগঞ্জ কবি নজরুল পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মইন উদ্দিন বলেন, পায়ে হেঁটে গেলে ঘণ্টা পাঁচেক, নৌকায় গেলে আরও বেশি। টুঙ্গিপাড়া ছিল তখন একেবারে অজপাড়াগাঁ। রাস্তাঘাট ছিল না।
কিন্তু ছিল নদী। মধুমতী নদী বয়ে যাচ্ছে এক পাশ দিয়ে। আর আছে শাখানদী—বাইগার। আছে কাটাগাঙ। সেই নদী দিয়ে স্টিমার চলত। স্টিমারে করেই খুলনা; সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা। স্টিমারে করেই ঢাকা—সদরঘাট। শেখ মুজিব এভাবেই টুঙ্গিপাড়া থেকে কলকাতা অথবা ঢাকায় যাতায়াত করতেন।
টুঙ্গিপাড়া আজ আর দুর্গম কিংবা অখ্যাত নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান আর সমাধিস্থল এই টুঙ্গিপাড়া। বিবিসির জরিপে তিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি আমাদের স্বাধীনতার মহান স্থপতি।
২.
ইটের তৈরি ঘর, পাকা মেঝে। ওপরে ঢেউটিনের চৌচালা। এই রকম একটা ঘরে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের। বাবা শেখ লুত্ফর রহমান। মা সায়েরা খাতুন। বাবা ছিলেন দেওয়ানি আদালতের সেরেস্তাদার। পিতৃপুরুষেরা কোঠাবাড়ি বানিয়েছিলেন। সেই দালানটা মুজিবের জন্মের সময়ও ছিল পরিত্যক্ত। মুজিবের শৈশবের নাম ছিল ‘খোকা’।
খোকা যে ঘরে জন্মেছিলেন, সেই ঘরটা এখন নেই। একাত্তর সালে সেই বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পরে, দেশ স্বাধীন হলে, সেখানে নির্মিত হয় দোতলা ঘর। এখন সেটা তেতলা হয়েছে। সেই ভবনের নিচতলায় যাই। বারান্দাতেই দেয়ালে টাঙানো ছবি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট যাঁরা মারা গিয়েছিলেন, তাঁরা এখানে ফ্রেমে বাঁধা ছবি। কেয়ারটেকার বৈকুণ্ঠ আমাদের দরজা খুলে দেন। আমরা ভেতরে যাই। একটা ঘরে বঙ্গবন্ধুর পিতামাতার ব্যবহূত জিনিসপাতি শোকেসে সাজানো।

৩.
বাড়ির সামনেই ছিল খাল। মধুমতী নদী থেকে বাইগার নদী, তারই একটা শাখা কাটাগাঙ। শেখবাড়ির একেবারে কোল ঘেঁষে। এই খালটাই ছিল তখন যাতায়াতের প্রধানতম পথ। আমরা, ১৭ নভেম্বর ২০০৯, যখন টুঙ্গিপাড়ায় যাই, তখনো দেখতে পাই এই ছোট্ট খালে নৌকা—বড় বড় নৌকা, যদিও খালটা তত স্রোতস্বিনী নয়। ছোট্ট খোকা এই খাল ধরে নৌকায় চড়ে যেতেন গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। একদিন নাকি তিনি নৌকা থেকে পড়েও গিয়েছিলেন।
গিমাডাঙ্গা স্কুলে যাই। এটা এখন উচ্চবিদ্যালয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ও আছে বড় স্কুলমাঠের এক পাশে। এখন কল্পনাই কেবল করা যায়, বঙ্গবন্ধু যখন পড়তেন, তখন স্কুলটা কেমন ছিল; কিন্তু বাস্তব রূপটা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবকিছু বদলে যাচ্ছে, উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে কিনা।

৪.
গোপালগঞ্জ মথুরানাথ মিশনারি স্কুলে পড়তেন শেখ মুজিব। বাবা আদালতের কর্মচারী। সেই সুবাদে আদালতের কাছেই টিনের ঘর তুলে সেখানে থাকতেন শেখ লুত্ফর রহমান। মুজিবও থাকতেন বাবার সঙ্গে।
আমরা সেই পুরোনো বাড়িটার খোঁজে ঢুঁ মারি আদালতের পেছনের দিকে। সেই বাড়িটা আর নেই। একাত্তরে এই বাড়িতেও পাকিস্তানি সৈন্যরা আগুন দিয়েছিল।
বাড়িটা নেই। কিন্তু বাড়ির উল্টো দিকে বঙ্গবন্ধুর নামে একটা বড়সড় জমিখণ্ড আছে। সেখানে এখন আওয়ামী লীগের কার্যালয়। পেছনে পুকুরের পাড়ে একটা আমগাছ ছিল, গোড়া বাঁধানো। সেখানে তরুণ মুজিব বক্তৃতা দেওয়া অনুশীলন করতেন। সেই আমগাছটাও আর নেই।
বাবার একটা সাইকেল ছিল। সেটা নিয়ে শেখ মুজিব চষে বেড়াতেন গোপালগঞ্জ শহর। পুরো শহরে কোনো পাকা রাস্তা ছিল না। তাঁর সাইকেল সারিয়ে দিতেন যিনি, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মুজিব একদিন গোপালগঞ্জ এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
ওই মিশনারি স্কুলেই একবার এসেছিলেন তত্কালীন অখণ্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক, বাণিজ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি। স্কুল পরিদর্শন শেষে দুই মন্ত্রী ফিরে যাচ্ছেন, কিশোর শেখ মুজিব তাঁর দলবল নিয়ে তাঁদের পথরোধ করে দাঁড়ান, ‘আপনারা যে চলে যাচ্ছেন, আমাদের হোস্টেলের ছাদ দিয়ে যে পানি পড়ে, তার কী হবে?’ শেরে বাংলা হোস্টেলের ছাদ সারানোর জন্য এক হাজার ২০০ টাকা মঞ্জুর করেন। আর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চিরকুট পাঠিয়ে ডেকে পাঠান মুজিবকে। তাঁর সাহসের প্রশংসা করেন। ভবিষ্যৎ ইতিহাসের একটা বড় সম্ভাবনার বীজ উপ্ত হয় ওই মুহূর্তে। কারণ এরপর মুজিব কলকাতা গিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করবেন এবং হয়ে উঠবেন একজন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী। আমরা সেই মিশনারি স্কুলে যাই। স্কুলটার চিহ্নমাত্র নেই। সেখানে আজ বঙ্গবন্ধু মহাবিদ্যালয়।

৫.
ফিরে আসি টুঙ্গিপাড়ায়। প্রায় সোয়া দুই শ বছর আগে শেখ মুজিবের পূর্বপুরুষেরা এসে বসত গেড়েছিলেন টুঙ্গিপাড়ায়। কলকাতা থেকে কারিগর এনে বানিয়েছিলেন কোঠাবাড়ি। তারপর বংশবৃদ্ধি ঘটতে লাগল, বাড়িঘরের সংখ্যাও যেতে লাগল বেড়ে। লুত্ফর রহমান বানিয়েছিলেন টিনে ছাওয়া ইটের বাড়ি। সেই বাড়িতেই জন্ম হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর। সেই বাড়িতেই ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার জন্ম হয়। জন্ম হয় শেখ কামাল আর শেখ জামালের।
বাড়িতে গ্রামোফোন ছিল। বঙ্গবন্ধু বারবার জেলে যেতেন, আর বেগম মুজিব এতগুলো ছেলেপুলে নিয়ে পড়তেন অগাধ সলিলে। সংসার চালানোর প্রয়োজনে তাঁকে সংসারের বহু কিছু বিক্রিও করে দিতে হয়েছিল। তবে গ্রামোফোনটা তিনি বিক্রি করেননি।
টুঙ্গিপাড়া আর গোপালগঞ্জের মানুষ এখনো শেখ মুজিবের স্মৃতিশক্তি আর দয়া-দাক্ষিণ্যের কথা স্মরণ করে। গ্রামের প্রবীণজনেরা যেমন সাক্ষ্য দিলেন, ব্রিটিশ আমলের দুর্ভিক্ষের সময় শেখ মুজিব তাঁর বাবার ধানের গোলা কেটে দিয়েছিলেন গ্রামবাসীর মধ্যে ধান বিতরণ করার জন্য, তেমনি তিনি যে গায়ের কাপড় খুলে দান করতেন, সে কথাও গ্রামের লোকেরা খুব বড় মুখ করে বলেন। সন্দেহবাতিকদের মনে হতে পারত যে, পরবর্তীকালে তাঁর জীবনী লেখকেরা এসব গুণের কথা বানিয়ে লিখেছেন। কিন্তু টুঙ্গিপাড়ার আকাশে-বাতাসে এসব কথা কিংবদন্তি হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।
আর তাঁর স্মৃতিশক্তির কথা? গোপালগঞ্জ শহরের কবি নজরুল পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক মইন উদ্দিন বলছিলেন, তাঁর সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল, পরে দেখলেই চিনতেন, নাম ধরে ডাকতেন। এমনকি একবার রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু যাচ্ছেন গাড়িতে, মইন উদ্দিন হাঁটছেন ঢাকার গুলিস্তানের ফুটপাত দিয়ে, তিনি গাড়ি থামিয়ে তাঁকে তুলে সোজা নিয়ে গেলেন বঙ্গভবনে। গ্রামের প্রবীণ লোকেরা সাক্ষ্য দেন, দেখা হলেই বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘এই তুই অমুকের পোলা না? বাড়ির সবাই কেমন আছে!’

৬.
১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট টুঙ্গিপাড়ার ছেলে ফিরে এলেন টুঙ্গিপাড়ায়। তত দিনে তিনি তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত বাংলার মানুষের স্বাধীনতা অর্জন করে ফেলেছেন। তিনি আমাদের বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। সকালবেলা টুঙ্গিপাড়ায় স্থাপিত ওয়ারলেসে নির্দেশ এল, কয়েকটা কবর যেন খুঁড়ে রাখা হয়। পরে নির্দেশ আসে, না, একটা কবর খুঁড়লেই চলবে। জানাজায় তেমন লোক হয়নি, কারণ টুঙ্গিপাড়াবাসী ভেবেছিল, যারা বঙ্গবন্ধুকে মেরে হেলিকপ্টারে আনতে পারে, তারা পাকিস্তানি সৈন্য। তারা এর আগেও এই বাড়িতে আগুন দিয়েছিল। ৫৭০ কাপড় কাচা সাবান দিয়ে গোসল সারানো হয় বঙ্গবন্ধুর। রিলিফের শাড়ির পাড় কেটে বানানো হয় তাঁর কাফনের কাপড়।
টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে পৈতৃক কবরস্থানে পাশাপাশি শুয়ে আছেন বঙ্গবন্ধুর বাবা-মা। এরই পাশে কবর খুঁড়ে সমাহিত করা হয় বঙ্গবন্ধুকে।

৭.
সে ছিল খুবই কালো এক সময়। বঙ্গবন্ধুর নাম নিতে কেউ সাহস পেত না। বঙ্গবন্ধুর কবর পাহারা দিয়ে রাখত সঙ্গিনধারীরা। মৃত মুজিবকেও তাদের বড় ভয়। তাঁর কবরের গায়ে কোনো নামফলক ছিল না। বঙ্গবন্ধুর দূরসম্পর্কের ভাই টুঙ্গিপাড়ার শেখ কবির বলেন, দু-তিন বছর কবরটা কাঁচাই ছিল, তারপর চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সেটা পাকা করে তাতে বঙ্গবন্ধুর নামফলক স্থাপন করেন।
১৯৯৪-৯৫ সাল। শেখ হাসিনা তখন বিরোধী দলের নেত্রী। তিনি ও শেখ রেহানা—বঙ্গবন্ধু পরিবারের দুজন মাত্র জীবিত সদস্য—তাঁদের ৩২ নম্বরের বাড়ি আর টুঙ্গিপাড়ার বাড়ির সব সম্পদ ও সম্পত্তি দান করে দেন বঙ্গবন্ধু ট্রাস্টকে, যেন তার মাধ্যমে গড়ে ওঠে স্মৃতি জাদুঘর, বঙ্গবন্ধুর সম্পদ হয়ে ওঠে জাতির সবার।
ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লিমিটেডকে দেওয়া হয় টুঙ্গিপাড়ায় সমাধিসৌধ-চত্বর পরিকল্পনার কাজ। ভিত্তির তিন স্থপতি—ইকবাল এহসান, ইকবাল হাবিব আর ইশতিয়াক কবির।
ইকবাল হাবিবকে প্রশ্ন করি, এই সমাধিসৌধের নকশা করার পেছনে কী চিন্তা কাজ করছিল?
ইকবাল হাবিব বলেন, ‘শেখ হাসিনা আমাদের বোঝান, বঙ্গবন্ধু ছিলেন মাটি থেকে উঠে আসা এই মাটির সন্তান। এই যে বাড়িটা, তার পাশে বড় পুকুর, সেই পুকুরে ব্যাঙ ডাকবে, ঝিঁঝি ডাকবে, তার শব্দ যেন এই সমাধিসৌধে হারিয়ে না যায়। আমরা সেটা রাখার চেষ্টা করেছি। বঙ্গবন্ধুর বাবা-মায়ের কবর দুটো একটা শ্বেতপাথরের কাঠামো দিয়ে ঢাকা আছে, সেটা তেমনি রেখে আমরা আরেকটা বড় কাঠামো বানানোর কথা ভাবি, যাতে প্রাকৃতিক আলো আর বাতাস ঢুকতে পারে। এর এক পাশ খুলে দেওয়া যাবে, যখন অনেকেই এসে ভিড় করবে।
নাসির আলী মামুন, সাংবাদিক সুব্রত সাহা
আর আমি সেই সমাধিত্রয়ের চত্বরে প্রবেশ করি। স্থানীয় কলেজের ছাত্ররা এসেছে দলবেঁধে, বঙ্গবন্ধুর সমাধি দেখতে এবং তাতে ফুল দিতে। আমাদের সামনেই তাদের জন্য কাঠের সেই দরজা খুলে দেওয়া হয়।
শ্রদ্ধাজাগানিয়া ভাব জাগে এই চত্বরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। এক পাশে দুটো ছোট টেবিলের মতো, সেখানে কোরআন শরিফ রাখা; শেখ হাসিনা এখানে এলে কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করেন।
এরপর পুরো সৌধচত্বর আমরা ঘুরে ঘুরে দেখি। প্রকৃতির দানে সবুজ টুঙ্গিপাড়ার গাছগাছড়া আর জলাশয়ও ধারণ করে আছে সমাধিক্ষেত্রটা। একটা জায়গায় অনবরত পানি ঝরছে, নিচে লেখা অন্নদাশংকর রায়ের কবিতা:
‘যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’
চত্বরটা বড়। স্থাপনাশৈলী আন্তর্জাতিক মানের। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সরকারি খরচে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। চত্বরে পাঠাগার আছে, চিত্র প্রদর্শনীর গ্যালারি আছে, বঙ্গবন্ধুকে বহন করে নিয়ে আসা
সেই কফিন আছে। খোলা মঞ্চ আছে, যেখানে অনুষ্ঠান হয় বিভিন্ন উপলক্ষে। মসজিদ আছে।
আমরা সব ঘুরে ঘুরে দেখি। নাসির আলী মামুন বলেন, কমপ্লেক্সটা আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে।
আমি বলি, হ্যাঁ। খুব সুন্দর। তবে আমি আমেরিকায় মার্টিন লুথার কিংয়ের বাড়ি, কেনেডি স্মৃতিকেন্দ্র ও জিমি কার্টার কেন্দ্রে গেছি। ওরা যেমনভাবে পুরো কমপ্লেক্সটা পরিচালনা করে, আমাদের সেই জায়গাটায় পৌঁছতে ঢের বাকি। ওদের একটা ঘরে হয়তো আধঘণ্টা পর পর প্রামাণ্য ছবি দেখানো হচ্ছে, টেলিভিশনের পর্দায় বিভিন্ন সময়ে দেওয়া কেনেডি বা কার্টারের ভাষণ প্রচার করা হচ্ছে, কোনো ঘরে কিনতে পাওয়া যায় স্মারক, খাবারের ঘরটা আন্তর্জাতিক মানের, সেই রকম করা গেলে বঙ্গবন্ধু সমাধিচত্বর বা ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরটা নতুন প্রজন্মের জন্য আকর্ষণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ী হয়ে উঠতে পারে।
আমরা বেরিয়ে আসি বঙ্গবন্ধুর সমাধিক্ষেত্র থেকে। পেছনে তাকিয়ে দেখি ফুল ফুটে লাল হয়ে আছে গাছে, আর ঝরনাটি থেকে জল ঝরেই চলেছে। এই ঝরনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, গৌরী-যমুনার জলধারাও হয়তো শুকিয়ে যেতে পারে, কিন্তু বাঙালির ইতিহাসে শেখ মুজিবের কীর্তি মুছবে না। কারণ হাজার বছরের বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১-এ প্রথম বাঙালি তার নিজস্ব রাষ্ট্র অর্জন করে, আর সেটা অর্জন করার জন্য ১৯৪৭-এর আগে থেকেই বঙ্গবন্ধু নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করতে শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন ঘাতকের বুলেট তাঁর বক্ষ ভেদ করে, তখনো নিশ্চয়ই তিনি বলছিলেন, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলাদেশ আমার দেশ।

source: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2009-11-21/news/20713

পরবর্তী পৃষ্ঠা »